আজ: ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইংরেজি
শিরোনাম

স্লিপিং প্যারালাইসিস বা বোবায় ধরার কারণ

ডেস্ক: ‘বোবায় ধরা (স্লিপিং প্যারালাইসিস)’ এই শব্দটির সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। সাধারণত বোবায় ধরা বলতে আমরা বুঝি, যখন একজন ব্যক্তির ঘুমিয়ে পড়া বা ঘুম থেকে জেগে ওঠার সময়ে শরীরের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়াতে না পারার একটি অলৌকিক অভিজ্ঞতার নাম।

অন্যভাবে, যখন কাউকে বোবায় ধরে, তখন সে তার শরীরের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়াতে পারে না, অসারতা অনুভব করে। এটি ঘটে একজন ব্যক্তির ঘুমিয়ে পড়া বা জেগে ওঠার পূর্ব মুহূর্তে।

‘বোবায় ধরা’ কেন হয়বা হ্যালুসিনেশন কেন হয়?
ছোটবেলায় একবার এ রকম অভিজ্ঞতা হলে দাদির কাছে যখন জিজ্ঞেস করলাম তখন দাদি বললেন, যখন কেউ চিত হয়ে শুয়ে থাকে আর তার পায়ের দুই আঙুল নাক বরাবর থাকে তখন তাকে বোবা ভূত এসে ভর করে।

তারপর অনেকের কাছেই এ রকম উত্তর বা এর কাছাকাছি উত্তরই পেয়েছি। সবার কথার মর্মার্থ এই যে, বোবা নামক ভূত যখন মানুষের ওপর ভর করে তখন বোবায় ধরে।

কিন্তু ব্যাপারটা কি আসলেই তাই? একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হিসেবে এমন উত্তর মেনে নেওয়া কখনোই সম্ভব না। যাই হোক, বোবায় ধরার বৃত্তান্ত বলার আগে বলে নেই আসলে ‘বোবায় ধরা কী? আর এতে হ্যালুসিনেশন কীভাবে হয়?

বোবায় ধরা বা স্লিপিং প্যারালাইসিস কী?
আমাদের অনেকেরই বোবায় ধরার অভিজ্ঞতা হয়েছে। মাঝে মাঝে রাতের বেলা ঘুমের সময় দেখা যায় আমরা ঘুম থেকে জেগে উঠি, কিন্তু হাত-পা নাড়াতে পারি না। চাইলেও পারি না, মনে হয় যেন কেউ একজন আমার ওপর চেপে বসে আছে। অনেক সময় ঘুম থেকে জেগে উঠে হাত-পা নাড়ানো তো যায়ই না, তার ওপর অনেক অলৌকিক জিনিস দেখা যায়! এটাই মূলত ‘বোবায় ধরা’ বা ‘স্লিপিং প্যারালাইসিস’।

আসুন এবার জানা যাক কেন বোবায় ধরে-
মানুষ যখন ঘুমায় তখন ঘুমের মাঝে REM (rapid eye movements) চক্র চলতে থাকে। মানুষের স্বপ্ন দেখার পর্যায়কেই বলা হয় REM । মানুষ ঘুমের মধ্যে এই চক্রে থাকাকালে মস্তিষ্ক শরীরের কার্যকলাপ বন্ধ করে রাখে।

কারণ, স্বপ্ন দেখে মানুষ সেসবের রি-অ্যাকশন হাত-পা নাড়িয়ে করতে পারে। আর এতে নিজের দেহের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই স্বপ্নে আমরা হাঁটাহাঁটি, দৌড়াদৌড়ি, মারামারি যাই-ই করি না কেন, বাস্তবে ঘুমের সময় আমাদের শরীর কিন্তু স্থির হয়ে থাকে।

যদি কখনো REM চক্র চলাকালে শরীরের কার্যকলাপ বন্ধ না থাকে, তখন অনেকেই ঘুমের মাঝে চিৎকার করে, হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে। ঠিক তেমনি বিপরীতভাবে অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ ঘুম থেকে ঠিকই জেগে ওঠে কিন্তু তখনো শরীরের কার্যকলাপ বন্ধ থাকে।

শরীর বুঝতে পারে না যে সে জেগে উঠেছে। ঘুম থেকে জেগে উঠলেও একই সঙ্গে শরীর যেমন বুঝতে পারে না ঠিক সেভাবেই REM চক্রও চলতে থাকে। যখন দুটো একসঙ্গে হয় সেই অবস্থাকেই বলে ‘বোবায় ধরা’। এই অবস্থা কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

REM চক্র যখন চলে মানুষ তখন তার অভিজ্ঞতা থেকে নানা কিছু স্বপ্নে দেখে। কিন্তু মানুষ যদি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখে তাহলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়ায়? হ্যাঁ ঠিক তাই, মানুষ জেগে থাকলে বাস্তবে স্বপ্নের জিনিসগুলো দেখতে পায়।

আর মানুষ যেহেতু স্বপ্নে তার বাস্তব অভিজ্ঞতার একটা মিশ্র রূপ দেখতে পায়, তা-ই বাস্তবে সেসব আজগুবি-অলৌকিক জিনিসপত্র দেখতে পায়। যাকে ‘হ্যালুসিনেশন’ বলা হয়।

ধরুন আপনি স্বপ্ন দেখছেন। কী দেখছেন সেটা নির্ভর করে আপনার দৈনন্দিন কাজের ওপর। আপনি বাস্তবে গরুও দেখেছেন, ছাগলও দেখেছেন। স্বপ্নে গরুর দেহে ছাগলের মাথা দেখাটা তাই অস্বাভাবিক কিছু না। কারণ স্বপ্নে বাস্তবের জিনিস হুবহু দেখার সঙ্গে অনেক সময় একটা মিশ্র চিত্রও তৈরি করে। যা-ই হোক, স্বপ্নে গরুর দেহে ছাগলের মাথা মানা যায়। কিন্তু বাস্তবে যদি দেখেন, তখন? এমন সময়েই মানুষ অশরীরী বা অলৌকিক বস্তুর অবতারণা করে। আর ঘুম থেকে জেগে উঠে যদি REM চক্র চলতে থাকে, তাহলে এমন গরুর দেহে ছাগলের মাথা বাস্তবেও দেখা সম্ভব, যেহেতু স্বপ্ন দেখার পর্ব এখনো শেষ হয়নি।

তাহলে আসল ব্যাপারটা হলো, স্বাভাবিকভাবে স্বপ্ন দেখার সময় REM চক্র চলে আর এ সময় শরীরের স্বাভাবিক কার্যকলাপ বন্ধ থাকে। কিন্তু এই অবস্থার ব্যাঘাত ঘটলেই বোবায় ধরে আর হতে পারে ‘হ্যালুসিনেশন’। এটাই হলো আসলে বোবায় ধরার পেছনের গল্প।

কেন বোবায় ধরে?
সাধারণত ৫-২৫ বছর বয়সীদের বোবায় বেশি ধরে থাকে। বোবায় ধরার একটা প্রধান কারণ হচ্ছে অনিয়মিত ঘুম। মানুষ যখন চিন্তিত থাকে বা প্রেসারে থাকে তখনো বোবায় ধরতে পারে।

দেখা গেছে যারা নিয়মিত সময়ে ঘুমায় না এবং প্রয়োজনের চেয়ে কম ঘুমায় তারাই হ্যালুসিনেশনে বেশি আক্রান্ত হয়। অনেক সময় দেখা যায় অতিরিক্ত ঘুমালেও বোবায় ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়। হ্যালুসিনেশন বা বোবায় ধরার কোনো নির্ধারিত চিকিৎসা নেই। যদিও অনেক ডাক্তার বা সাইকিয়াটিস্ট কিছু কিছু ওষুধ প্রেস্ক্রাইব করে থাকেন। সেগুলো মূলত ঘুম ঠিকমতো হওয়ার ওষুধ।

বোবায় ধরা থেকে বাঁচার উপায়?
স্লিপিং প্যারালাইসিস বা বোবায় ধরা বা হ্যালুসিনেশন থেকে বাঁচতে হলে সময়মতো এবং নিয়ম করে ঠিকমতো ঘুমাতে হবে এবং চিন্তা-ভাবনা বা প্রেসার থেকে মুক্ত থাকতে হবে।

মনে রাখবেন, বিষয়টি ঘুমের ব্যাঘাতের কারণে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া। বাস্তবে বোবায় ধরার পেছনে কোনো অলৌকিকতা বা ভূত নেই।

ঘুমের ব্যাঘাত হলে স্লিপিং প্যারালাইসিসের মাধ্যমে হ্যালুসিনেশন হতে পারে। নিয়মিত এবং পরিমিত ঘুমই এই হ্যালুসিনেশন থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একমাত্র এবং সহজ উপায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •