আজ: ২৩শে মে, ২০১৯ ইংরেজি
শিরোনাম

দিন বদলের কারিগর ডিআইজি হাবিবুর রহমানের প্রয়াস

স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরলেন হিজড়া শাম্মী ও নিশাত

জাহিদুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক

দৃপ্ত প্রত্যয়ে দেশে ফিরে এলেন শাম্মী ও নিশাত। উড়োজাহাজ দেশের মাটি স্পর্শ করতেই না করতেই ওদের চোখ ভিজে আসে ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতায়। বিমান থেকে অবতরণ করছিলেন আর ভাবছিলেন যেন আপেক্ষিক অর্থেই ভিন্ন এক জগত ছেড়ে আলোর জগতে অবতরণ করা জীবনের কথা। সেই আবেগে অশ্রু টলমলে চোখে কৃতজ্ঞতার সবটুকুই উজাড় করে দিচ্ছিলেন উত্তরণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান পুলিশের ডিআইজি হাবিবুর রহমানকে।

কারন এই মানুষটিই তাদের মতো অনগ্রসর জনগোষ্ঠির জীবনমান উন্নয়নের নায়ক। এক অর্থে যার পরিচয় দেবতূল্য মানুষ।যার ছোঁয়ায় আজ বদলে গেছে অচ্ছুত আর বঞ্চনার ‘হিজড়া জীবন’।

মাসব্যাপী ‘উচ্চতর কেশ সজ্জা প্রশিক্ষণ’ শেষে গত ২ মার্চ বিকেলে দেশে ফিরেছে হিজড়া শাম্মী ও নিশাত। সঙ্গে নিয়ে এসেছে দারুন দারুন সব অভিজ্ঞতা,সমাজ বদলে দেবার প্রত্যয় আর অসাধারণ সব স্বপ্ন।

কেশ সজ্জা বিষয়ে তারা ভারতের কোলকাতায় প্রশিক্ষণ নিয়েছে বিশ্বখ্যাত হেয়ার স্পেশালিষ্ট জাভেদ হাবিব প্রতিষ্ঠিত হাবিব অ্যাকাডেমি থেকে।

চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি উত্তরণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে উচ্চতর কেশ সজ্জা প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে দেশে ছেড়েছিলেনে তৃতীয় লিঙ্গের দুই সদস্য শাম্মী ও নিশাত। কোলকাতায় অবস্থিত জাভেদ হাবিব অ্যাকাডেমীতে ৩০ দিনের ‘উচ্চতর কেশ সজ্জা’ বিষয়ক প্রশিক্ষণটি তাদের আরো বেশি আত্ন প্রত্যয়ী হিসেবে গড়ে তুলেছে- বলছিলেন শাম্মী ও নিশাত।

‘সকল কৃতজ্ঞ কিন্তু পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান স্যারের। আজ তার অদম্য প্রয়াস আর চেষ্টাতেই আমরা আলোর পথে। আমাদের দেখাদেখি হিজড়াদের অনেকেই আজ স্বপ্ন দেখছেন আত্ন নির্ভরশীল জীবনের। আমরা শিখেছি,সমাজের মূল স্রোতে মিশে গিয়ে কি করে বাঁচতে হবে। সমাজে মর্যাদা আর মূল্যবোধ বাঁচতে হবে’- আবেগে চোখ মোছেন শাম্মী।

দেশের বাইরে প্রশিক্ষণ কেমন হলো?

‘এক কথায় অসাধারণ। আমি অভিভূত,এক কথায় উচ্ছসিত। বলছিলেন নিশাত।

তিনি জানান,বেশ কয়েক বছর ধরে আশুলিয়ায় উত্তরণের প্রথম বিউটি পার্লারটি পরিচালনা আসছিলো শাম্মী। সমাজের তাচ্ছিলের ‘হিজড়া’ থেকে ‘বিউটিশিয়ান’ পরিচয়ে তার সাফল্য আমাকে আলোড়িত করে।

যোগাযোগ করলাম। আমাকে সুযোগ-ও দেয়া হলো। আজ আমি নিজেও গর্বিত। আমার জীবনের এই সাফল্যের প্রকৃত নায়ক আমাদের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার মানুষ ডিআইজি হাবিবুর রহমান’।

‘এই প্রশিক্ষণ আমাদের প্রচন্ড রকমের আত্মবিশ্বাসী করেছে।

আসলে কত বড় পরিসরে আমাদের কাজ করার সুযোগ রয়েছে গেছে –এই প্রশিক্ষণ না পেলে বুঝতামই না’- যোগ করেন শাম্মী।

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় পুলিশ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমানের নজরে আসে,সাভারে বেদে সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশই এই কারবারে যুক্ত।

এই জনগোষ্ঠিকে শিক্ষিত ও সচেতন করে তাদের পূর্ণবাসনে চাকরি,প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে আলোচনায় আসেন তৎকালীন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান।

বেদে জনগোষ্ঠিকে সাড়ে চার’শ বছরের গ্লানিময় জীবন মুক্তি দেন। বেদে সম্প্রদায়ের মানুষদের অন্ধকার জীবন থেকে আলোর ধারায় নিয়ে আসতে গুণীজনদের নিয়ে গঠন করেন উত্তরণ ফাউন্ডেশন। বেদে পাড়ায় কারিগরী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র,স্কুল,মসজিদ ও ঈদগাঁসহ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কল্যানমূলক নানা পদক্ষেপ প্রশংসা পায় দেশি বিদেশি গণমাধ্যমে।

সেই ধারাবাহিকতায় ‘হিজড়া’ বলে পরিচিতি সমাজের পিছিয়ে পড়া তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যদের জীবনমান উন্নয়নে পদক্ষেপ নেন তাদেরকে যথাযথ কর্মসংস্থানে। দৃষ্টিভঙ্গি বদলে সামাজিকভাবে সন্মানিত করেন হিজড়াদের।তাদের কর্মসংস্থানে ঢাকার সাভার, আশুলিয়া মানিকগঞ্জ সদরে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘উত্তরণ বিউটি পার্লার’।

এ ছাড়াও ঢাকার কামার পাড়া,গাইবান্ধার ডেভিড কোম্পানী পাড়ায় এবং রাজবাড়ী সদরে তিনটি ডেইরী ফার্ম স্থাপন করে অর্ধশতাধিক হিজড়ার ভাগ্য বদলে দেন।

অন্যদিকে ঢাকার মগবাজারে বুটিক হাউস ও বুটিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মিনি গার্মেন্টস, উত্তরার রাজউক মার্কেটে টেইলার্স, তুরাগ থানা এলাকায় টেইলার্স এবং ধামরাই বাজারে ১টি বুটিক হাউস স্থাপনের মাধ্যমেও অর্ধ শতাধিক হিজড়ার জীবনমান বদলে দিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান।

উত্তরণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ডিআইজি হাবিবুর রহমান জানান,মানুষ বেঁচে থাকে তাঁর কর্মে। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠিকে টেনে তোলা মানুষ হিসেবে আমাদেরই দায়িত্ব। কারণ বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে এই মানুষদের কর্ম সংস্থানের কোন বিকল্প নেই।

তিনি জানান,আমাদের যেসব পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন হলে অচিরেই আরো অর্ধশতাধিক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ পছন্দের সন্মানজনক পেশা আকঁড়ে ধরে নিজেদের সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

তিনি জানান,আমাদের প্রয়াসে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদল হচ্ছে। এখন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ পরিচালিত রূপসজ্জার কেন্দ্রগুলোতে (বিউটি পার্লার) আগের চাইতে ভিড় বাড়ছে।

মানুষ এটা বুঝতে পারছে,তারা অনেকে বেশি দক্ষ ও অভিজ্ঞ। এই আত্নবিশ্বাসটা কিন্তু আমরাই তৈরি করেছি। ভারতের ‘হাবিব ফাউন্ডেশন’ এর প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বখ্যাত কেশ বিশেষজ্ঞ (হেয়ার স্পেশালিষ্ট) জাভেদ হাবিবের সাথে আমরা একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। যার অধীনে প্রতি বছর উত্তরণ ফাউন্ডেশন মনোনীত তৃতীয় লিঙ্গের দুইজন সদস্যকে কোলকাতায় অবস্থিত জাভেদ হাবিব অ্যাকাডেমীতে ‘উচ্চতর কেশ সজ্জা’ বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

গত ২ মার্চ শাম্মী ও নিশাত ফিরেছে। নতুনরা স্বপ্ন দেখছে উচ্চতর প্রশিক্ষণের।এভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিকমানের কেশ সজ্জা বিশেষজ্ঞ তৈরি করছি।

‘উত্তরণ ফাউন্ডেশন’ এর সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান শায়ক জানান,পুলিশ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান এক অর্থে এই সময়ের সমাজ সংস্কারক। পেশাগত জীবনে একজন সফল পুলিশ কর্মকর্তা। কিন্তু পেশাগতি গন্ডির বাইরে তার ভাবনাটা সব সময়ই অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির কল্যানে কাজ করা। সেই প্রক্রিয়া যুক্ত থাকতে পেরে আমি নিজেও গর্বিত।

উত্তরণ ফাউন্ডেশন সমন্বয়কারী এম এম মাহবুব হাসান জানান,২০১৩ সালে সরকার হিজড়াদেরকে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মানিত করেছেন।তা সত্বেও সমাজে তারা ছিলেন অবাঞ্ছিত ও অবহেলিত।মানুষ এখনো যথেষ্ট সচেতন নন।তাদেরকে দেখা হয় ঘৃণার চোখে,অবজ্ঞার চোখে।পুলিশের ডিআইজি হাবিবুর রহমান তাদের অভিশপ্ত ও গ্লানিময় জীবন থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন। ভালোবাসা আর সন্মান নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। তাদের পুনর্বাসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন। এখন সফল এই মানুষগুলোই নিজেরা এক একজন নিজেদের গোষ্ঠিতে আইকন। তাদের আলোয় আলোকিত এই সমাজ,রাষ্ট্র দেশ। আমরা এই স্বপ্নটা নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি- যোগ করেন এম এম মাহবুব হাসান।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •