আজ: ২৫শে আগস্ট, ২০১৯ ইংরেজি
শিরোনাম

`অবাক হলেও সত্য’ শেরপুরের পুলিশ থাকে ‘দুধে-ভাতে’

জাহিদুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক । বাংলালাইভটোয়েন্টিফোর.কম

শেরপুর জেলার পুলিশ থাকে দুধে – ভাতে। গল্প নয়,সত্য। সপ্তদশ শতাব্দীতে ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর রচিত ‘আমার সন্তান’ কবিতার সাড়া জাগানো লাইন ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ – এই পংতিটিই ফিরে এসেছে শেরপুরে।সেখানে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের মুখে মুখে এখন পুলিশের খাবার নিয়ে প্রশংসা ।

পুলিশ লাইন্সে থেকে থানা।সর্বত্র আলোচনা খাবার মান পাল্টে যাওয়া নিয়ে। আসলেই দ্রুত সময়ের মধ্যে পাল্টে গেছে পুলিশ সদস্যদের খাবারের মান। মাসে একদিনের পরিবর্তে এখন সপ্তাহে প্রতিদিনই ‘বড় খানার’ স্বাদ পাচ্ছেন এখানকার পুলিশ সদস্যরা।প্রতি বেলার খাবারেও এসেছে আভিজাত্য, আমিষ আর পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ মেন্যু।আর দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা খাবারে অনিয়মের বৃত্ত থেকে বের করে আগের খরচেই উন্নত মানের খাবার পরিবেশনে ‘অসম্ভব’ ধারণাকে ‘সম্ভব’ প্রমান করেছেন শেরপুরের পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম স্যার- বলছিলেন,পুলিশ কনষ্টেবল আল কায়সার।

দেশে বিভিন্ন জেলায় পুলিশ লাইন্সের খাবার দাবার নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ সদস্য জানান,‘শুধু ভাত দিয়ে তো খাবারের তৃপ্তি-স্বাদ মিটতো না। পাতে দেওয়া হতো মাছ-মাংসের ছোট্র টুকরা। ডাল আছে তো ভাজি নেই। সবজি আছে তো ডিম নেই। খাবার টেবিলে থাকতো না পানির জগ-গ্লাস। খাওয়ার সময় গলা আটকে যেত। খাবার পানি।সেটাও ছিলো না  মান সম্মত। অথচ খাবার বাবদ প্রতি মাসেই  টাকা পরিশোধ করতে হতো। বলতে গেলে এসব দেখার তেমন কেউ ছিলো না।।সব কিছুর পেছনে ছিলো ’স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতি’। যে কারণে যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হতেন মেসের পুলিশ সদস্যরা। বড় কথা হলো,প্রতিবাদ করে কেউ ঝামেলাও বাঁধাতে চাইতো না। প্রতিবাদ করলেই অন্যত্র বদলী হতে হতো।আসলে বেড়ালের গলায় তো ঘন্টা বাঁধাও মুশকিল।

‘প্রচলিত এই অব্যবস্থাপনা,অনিয়ম আর দুর্নীতির কারনেও মেসের খাবারের মান নেমে যাওয়ায় অফিসারদের অনেকেই বাইরে খেতেন। পুলিশ লাইন্স ঘিরে তাই গড়ে উঠেছিলো হোটেল রেষ্টুরেন্ট। কিন্তু শেরপুরের এই চিত্র এখন কেবলই ইতিহাস।জেলা পুলিশের এসপি হিসেবে কাজী আশরাফুল আজীম স্যার দায়িত্ব গ্রহণের পর পুরোপুরি পাল্টে গেছে মেসের চিরচেনা এই দৃশ্যপট।

আগে পুলিশ লাইন্স ঘিরে বেশ কিছু খাবারের হোটেল রেষ্টুরেন্ট গড়ে উঠলেও  আপনা আপনিই সেগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কনষ্টেবল থেকে পুলিশ পরিদর্শক এমনকি পুলিশ সুপার-ও নিয়মিত গ্রহণ করেন এখানকার খাবার।

‘কি বলবো ভাই। বাড়ির খাবারের চাইতেও সেরা পুলিশ লাইন মেসের খাবার। আগে বাসায় গিয়ে খেতাম। এখন আমি এখানেই নিয়মিত খাই’- গর্বিত উচ্চরনে এমন কথাই বলছিলেন পুলিশ লাইনের রিজার্ভ ইন্সেপক্টর (আরআই) উত্তম কুমার সাহা।

অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে,বলা নেই কওয়া নেই,আকস্মিকভাবে এসপি স্যার মেসে চলে আসেন।নিজে পর্যবেক্ষন করেন খাবারের মান।কখনো নিজেই ফোর্সের  সাথে বসে আহার করেন। এমন-ও হয়েছে,ধরুন- মেস থেকে জেলা জজ মহোদয় বা জেলা প্রশাসক স্যারের বাসায় ডিউটিতে থাকা ফোর্সের খাবার পাঠানো হয়েছে।চলতি পথে এসপি স্যারের সামনে পড়েছে। কোন দেরি নেই,স্যার নিজে টিফিনের বাটি খুলিয়ে খাবার পরিক্ষা করে দেখেন, নির্দেশিত মান অনুযায়ী খাবার রয়েছে কি’না। যে কারণে খাবারের মান তো বেড়েছেই একই সাথে বেড়েছে খাবার নিয়ে পুলিশ সদস্যদের সন্তুষ্টি- যোগ করেন শেরপুর জেলা পুলিশের রিজার্ভ ইন্সেপক্টর (আরআই) উত্তম কুমার সাহা।

তিনি জানান,পুলিশ সদস্যদের জন্যে প্রতিদিন গরুর দুধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রথম দিকে দু’দিন পাউডারের দুধ দিয়ে নির্ধারিত মেন্যু ঠিক রাখার চেষ্টা করা হলেও স্যার বিষয়টি ধরে ফেলেন। কড়া নির্দেশনা দেন,গরুর খাটিঁ দুধই ফোর্সকে খাওয়াতে হবে। যে কারনে প্রতিদিন বিকেলে গোয়ালা দুধ নিয়ে আসেন। আমরা দুধের গুণাগুণ পরিক্ষা করে তবেই তা গ্রহণ করি। বলতে পারেন,আমাদের এখানকার পুলিশ আছে দুধে-ভাতে’ – বলছিলেন, উত্তম কুমার সাহা।

খাবার নিয়ে প্রায় অভিন্ন অনুভূতির কথা জানালেন,পোশাক ভান্ডারের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মহসীন তালুকদার।তিনি জানান,আগে মেসের খাবার খেতে পারতাম না। এসপি হিসেবে আজীম স্যার দায়িত্ব গ্রহণের পর পাল্টে যেতে লাগলো খাবারের মান।রাতারাতি উন্নত আর সমৃদ্ধি হতে লাগলো খাবারের মেন্যু। আগে  আমার মতো অনেকেই বাইরে খেতেন। যে কারনে পুলিশ লাইন্সের বাইরে জমজমাট ছিলো খাবারের হোটেলগুলো।কিন্তু এখন সবাই মেসমুখি হওয়ায় পাল্টে গেছে বাইরের চিত্র। খাবার  বিক্রির মানুষ না পেয়ে হোটেল গুলোই বন্ধ হয়ে গেছে।সবই সম্ভব হয়েছে এসপি স্যারের আন্তরিক প্রচেষ্টায়- যোগ করেন ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মহসীন তালুকদার।

তিনি জানান, মেসের খাবারের মান সঠিক কি না তা নির্ধারণকল্পে নিজেই সে খাবার খেয়ে দেখেন পুলিশ সুপার আজীম স্যার। খাবার শেষে মেসের সার্বিক কাজকর্ম সঠিকভাবে চলছে  কি’না সেদিক তদারকি করার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল), শেরপুর ।

সহকারী পুলিশ সুপার (সদর), শেরপুর স্যারকে পুলিশ লাইন্স মেস পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন)স্যারকে সভাপতি করেছেন।এসপি স্যার নিজে রয়েছেন

পুলিশ লাইন্স মেস পরিচালনা কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে। স্যারের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে শীতকালীন মেন্যুতে শনিবার সকালে ছিলো পরোটা, ডিম, ভাজি, সবজ্বি (ফুলকপি+সিম+ টমেটো), পাকা কলা,দুপুরে ভাত, গরুর মাংস/মুরগী মাংস, সবজ্বি (বাধাকপি+লাউ),ডাল এবং রাতে খিচুড়ী, ইলিশ ভুনা, দুধ।

রবিবার সকালে ছিলো সাদা রুটি, ডিম ভাজি, সবজ্বি (বাধাকপি+লাউ), পায়েস,দুপুরে ভাত, খাসির মাংস, পালং/লালশাক,ডাল এবং ভাত, রুই/শিং মাছ, সবজ্বি (বাধাকপি+লাউ), দুধ।সোমবার সকালে ছিলো পরোটা, গরুর কলিজা, সিদ্ধ ডিম, খেজুর রস/গুড়ের পায়েস।দুপুরে ভাত, গরুর মাংস, ডাল, পেপে/মিষ্টি কুমড়া/কলা ভর্তা আর রাতে ভাত, ভর্তা, ছোট মাছ (কাচকি/কাজলী/বাতাসী/ মলা/টেংরা), ডাল, দুধ। মঙ্গলবার সকালে ছিলো সাদা ভাত, আলু ভর্তা, ডিম ভাজি, ডাল,দুপুরের খাবার

ভাত, বড় মাছ (রুই/কাতলা),সবজ্বি (বাধাকপি+ লাউ), মুগডাল এবং

ভাত, গরুর মাংস, সবজ্বি (সিম+আলু+টমেটো), ডাল, দুধ। বুধবার সকালে ছিলো খিচুড়ী (পোলাও চাউল+মুগডাল), ডিম ভুনা, সুজি,দুপুরে

ভাত, গরুর মাংস, ডাল, আলু ভর্তা আর রাতে ভাত, মুরগীর মাংস, সবজ্বি(ফুলকপি+সিম+ টমেটো), ডাল, দুধ। বৃহস্পতিবার ছিলো সকালে   পরোটা, বুটের ডাল, ডিম, সেমাই

দুপুরে ভাত, মুরগীর মাংস, ডাল, সবজ্বি (লাউ + চিংড়ি) আর রাতের মেন্যুতে ভাত, খাসির মাংস, সবজ্বি (ফুলকপি+সিম+ টমেটো), ডাল, দুধ।শুক্রবার সকালে ছিলো খিচুড়ী, ডিম ভুনা, সুজি/ফিরনী

দুপুরে পোলাও, গরুর/মুরগীর মাংস, মুগের ডাল, দই

এবং রাতের খাবারে ছিলো ভাত, ভর্তা, ছোট মাছ (কাচকি/কাজলী/ বাতাসী/ মলা/টেংরা), ডাল, দুধ।এর বাইরে শীতকালীন মেন্যুতে শুক্রবার সকালে  ভাপা পিঠা কিংবা দুধ চিতই দেয়া হয়।সব মিলিয়ে প্রতি বেলার খাবার দাবারে থাকে আভিজাত্য আর পুষ্টি আমিষে ভরপুর।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে শেরপুরের পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম জানান,মানুষের নিরাপত্তা আর আইন শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত আমার জেলার পুলিশের ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব আমাদের। ওদের পছন্দের স্বাস্থ্যকর খাবার গুলোর ব্যবস্থা করেছি।ওরা খেয়ে এখন পরিতৃপ্তি পায়- এটা জেনেই আমার ভালো লাগে।

খোলনলচে মেসের খাবার বদলে দেয়া কি করে সম্ভব হলো?

‘আসলে একটুখানি সদিচ্ছা। আমরা চেষ্টা করেছি বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।যোগ করেন কাজী আশরাফুল আজীম।

তিনি জানান,সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্যে নবদ্বীপের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি জমিদার ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর।‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য রচনা করার জন্য মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে ‘রায় গুণাকর’ উপাধি প্রদান করেছিলেন। ১৭৬০ সালে কবির মৃত্যু হয়।কিন্তু তাঁর অমর উক্তি ধ্বনিত হয়েছে অন্নদামঙ্গলের কাব্যের মাঝি ঈশ্বরী কন্ঠে, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’- পংতি অনেকেরই মুখে মুখে।

আক্ষরিক অর্থে হলেও আমার শেরপুরের পুলিশ সদস্যরা আজ দুধে ভাতে থাকেন।তাদের চেহারায় পরিবর্তন এসেছে।পরিমিত সুষম আর পুষ্টিকর খাবার খেয়ে তাদের স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে। এখন তারা আরো নিষ্ঠা,আন্তরিকতা আর পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।এটাই আমার প্রাপ্তি- মৃদু হেসে যোগ করেন শেরপুর পুলিশে দিনবদলের ‘নায়ক’ পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  • 20
  •  
  •  
  •  

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান