আজ: ২২শে মে, ২০১৯ ইংরেজি
শিরোনাম

‘পাইলে খাই, না পাইলে নাই’

বাংলালাইভ ডেস্ক । খবর-দেশ রুপান্তর

তাদের সাহরি আর ইফতারে কোনো আড়ম্বর নেই। ছিন্নমূল মানুষ তারা। দিনরাত কাটে এখানে সেখানে। ঝড়, বৃষ্টি, রোদে ফুটপাতের পাশে পলিথিন আর চটের ঘরে জীবনযাপন তাদের। কেউ ভিক্ষা করেন, কেউ এটা-সেটা কুড়িয়ে বিক্রি করেন। চলতে হয় কায়ক্লেশে, চেয়েচিন্তে। রমজানেও সেই একই চিত্র। পুরো রমজানে তাদের সাহরি ও ইফতার সারতে হচ্ছে ফুটপাতে কিংবা মসজিদ-মাজারে। যখন যেখানে সুবিধা হয় সেখানে। কিছু না মিললে কাউকে কাউকে শুধু পানি খেয়েই সারতে হচ্ছে সাহরি। এরপর সন্ধ্যায় ইফতারের অপেক্ষা। আয়োজনও খুবই সামান্য। সামান্য মুড়ি, ছোলা, পেঁয়াজু। এর জন্যও কত হাপিত্যেশ। কখনো কখনো তা-ও মেলে না। ঢু মারতে হয় মসজিদ, মাজারে; যেখানে ইফতারের আয়োজন থাকে সেই জনসমাগমে।

গুলিস্তান মহানগর নাট্যমঞ্চ ও তার আশপাশ এলাকায় অসংখ্য ছিন্নমূল মানুষের বসবাস। তাদের একজন রেহেনা বেগম (৩৫)। তিনি জানান, প্রায় ১৫ বছর ধরে এখানেই থাকেন। সঙ্গে থাকে মেয়ে কথাকলি (৮)। স্বামী নিরুদ্দেশ। ভিক্ষার টাকায় চলতে হয় তাদের। সড়কের অপর পাশে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ৩ নম্বর গেটের সামনে থেকে ৩০ থেকে ৫০ টাকায় সাহরির খাবার কিনে মা-মেয়ে দুজনে ভাগ করে খান। আর বিকেলে তার মতো এখানকার আরও অনেকেই নিজেদের মধ্যে টাকা দিয়ে ১শ থেকে ২শ টাকায় ইফতার কেনেন। বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে ১০-১৫ জন মিলে খান। তবে সামান্য মুড়ি, ছোলা, পেঁয়াজু ছাড়া মুখরোচক, সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর কিছু সেখানে নেই।

সত্তরোর্ধ্ব মানিকজান বেগম। গুলিস্তানে মহানগর নাট্যমঞ্চের বাইরের খোলা জায়গায় কথা হয় তার সঙ্গে। ওই এলাকার ফুটপাত ও আশপাশে কখনো পিঠা, কখনো ভাত-তরকারির দোকানদারি করেন তিনি। ক্রেতার বেশিরভাগ তার মতোই ছিন্নমূল মানুষেরা। তিনি জানান, রোজার মাস শুরুর পর ভাতের ক্রেতা কম। তিনি নিজেও নিয়মিত রোজা রাখছেন। থাকেন শাহজাহানপুর বস্তিতে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে সময় কাটিয়ে সেখানেই ছেলে আর তার স্ত্রীর সঙ্গে ইফতার সারেন। যেদিন যা মেলে তা-ই দিয়ে সারতে হয় সাহরি আর ইফতার।

একই এলাকায় থাকেন ষাটোর্ধ্ব মোহাম্মদ আলী। কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় বাম পায়ে আঘাত পাওয়ার পর থেকেই তাকে চলতে হয় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। শ্মশ্রুম-িত আলী জানান, গাড়ি চালাতেন। ছোটবেলায় কিছু পড়াশোনাও করেছেন তিনি। স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয় কেউ নেই তার। ফুটপাতই তার ঘরবাড়ি। তিনি বলেন, ‘রাতে শুধু পানি খেয়ে সাহরি শেষ করেছি। আজ ইফতারের আগে কোনো মসজিদ বা মাজারে গিয়ে ইফতার সারব। আমার মতো অনেকেই তা করে। কেউ যদি কিছু দেয় তাতেই সারতে হবে ইফতার। এ ছাড়া উপায়ও নেই। মিললে খাই, না মিললে নাই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের বাম পাশের ফুটপাতে থাকেন নুরজাহান বেগম (৬০)। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে ঢাকা শহরের ফুটপাতে বসতি তার। ভিক্ষা করে জীবিকা চালান। কার্জন হলের সামনে এবং এর আশপাশে কেটে গেছে অনেক দিন। গত রাতে ৪০ টাকা দিয়ে ফুটপাতের একটি ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে ভাত, মাছ কিনে তা খেয়ে সাহরি সেরেছেন। আজকের ইফতারও ফুটপাতেই সারবেন। তিনি জানান, ভ্রাম্যমাণ কোনো ইফতারির দোকান থেকে ২০-৩০ টাকা দিয়ে মুড়ি, পেঁয়াজু কিনে এনে তাই খাবেন।

গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজার আর সুপ্রিম কোর্ট মাজারে দিনরাত ছিন্নমূল মানুষের বসতি। তারা অপেক্ষায় থাকেন রমজান মাসের। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অনেকেই রমজানে রোজাদারদের জন্য ইফতারের আয়োজন করে থাকেন। তাই ইফতারের অনেক আগ থেকেই ছিন্নমূলদের অনেকে ভিড় করেন মাজারে। সুপ্রিম কোর্ট মাজারে কথা হয় জয়নাল আবেদীনের সঙ্গে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার ভাটেরচর গ্রামের এই বৃদ্ধ ঢাকায় এসেছেন কয়েক দিন আগে। উদ্দেশ্য রমজানজুড়ে ভিক্ষা করা। এরপর ঈদের চাঁদরাতে ফের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়া। এখন তার দিনরাতের বেশিরভাগ কাটে সুপ্রিম কোর্ট মাজার এবং এর আশপাশের এলাকায়। তিনি জানান, সঙ্গে টাকা থাকলে সাহরি সেরে নেন। না থাকলে পানি খেয়ে নেন। আর দুপুর থেকে অপেক্ষায় থাকেন কেউ কিছু নিয়ে এলো কি না। পুরো রমজান এভাবেই চলবে বলে জানান তিনি।

সুপ্রিম কোর্ট মাজার গেটের সামনে দুই চাকাওয়ালা গাড়িতে বসে ভিক্ষা করেন চলৎশক্তিহীন অসুস্থ জোসনা বেগম (৬০)। কাছেই ফুটপাতের একটি ভ্যানগাড়ি থেকে ভাত-মাছ কিনে নেন রাতে। পরে তা দিয়ে সাহরি সারেন। আর ইফতারের আগে অনেকেই এটা-সেটা দিয়ে যান। তা দিয়ে সেরে নেন ইফতার। তবে পুরো রমজানে এমনটি হয় না। কোনো কোনো দিন কিছুই মেলে না। তিনি বলেন, ‘উঠার শক্তি নাই। কেউ কিছু দিলে ইফতার-সাহরি হয়। না দিলে না খাইয়া থাকতে হয়।’

সংবাদটি শেয়ার করুন
  • 2
  •  
  •  

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান

আপনার ই-মেইল আইডি গোপন রাখা হবে।